Posts

Showing posts with the label ছোট গল্প

দুইজন দয়ালু সেলসম্যান এবং একটি খারাপ মানুষ

রাস্তার মোড় ঘুরে আসার সময়ই ছেলেটি বৃদ্ধ লোকটিকে দেখতে পায়। আলো ঝলমলে মিষ্টির দোকানের ভেতর পরিপাটি করে সাজানো খাবারের দিকে তাকিয়ে আছেন বৃদ্ধ। গায়ের মলিন পোষাক দেখে বেশ বোঝাই যাচ্ছে তিনি এই দোকানের কাস্টমার নন। বৃদ্ধকে অতিক্রম করে আরো কিছুদূর এগিয়ে যাবার পরে ছেলেটি ভাবলো, আহারে বেচারা! মিষ্টির দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে অথচ ভেতরে ঢুকে কিনে খাবার সাধ্য নেই। খারাপ লাগারই কথা। ছেলেটি কি যেন চিন্তা করে ঘুরে দাঁড়াল। লোকটাকে একটা মিষ্টি কিনে দিলে কেমন হয়? বৃদ্ধ মানুষটি খুশিই হবে। ছেলেটি দোকানের সামনে ফিরে এসেছে। ততক্ষণে দোকানের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছেন একজন সেলসম্যান। হাতের মোড়কে সাজানো দুটি মিষ্টি তুলে দিয়েছেন বৃদ্ধের হাতে। বৃদ্ধ এবং সেলসম্যান, দু’জনের মুখেই তখন পরম আনন্দের হাসি। এই মানুষটা চা বিক্রি করেন। মতিঝিলের এই এলাকায় তিনি ছোট একটা চায়ের দোকান চালান দীর্ঘ দিন ধরে। কাজের ফাঁকে দুপুরে দোকানের ভেতরই খেয়ে নেন। খাবার সময় একটা ব্যাপার তিনি অনেক দিন ধরেই লক্ষ্য করছেন। তার আশে-পাশে বেশ কিছু বসার বেঞ্চ আছে। দুপুরে খাবার সময়টায় সেখানে কিছু রিক্সাওয়ালা এবং ভিক্ষুক বসে থাকে। বসে বসে যে কাঠ ফাটা দুপুরের...

যে টাকায় মিশে থাকে ঘৃণা আর অভিশাপ

সত্তরোর্ধ মানুষটি খোঁড়াতে খোঁড়াতে অফিসারের রুমে ঢুকলেন। তিনি বেশ চিন্তায় আছেন। গত কয়েক মাস ধরেই তার পানির বিল বেশি আসছে। হিসাবে তিনি যে পরিমাণ পানি খরচ করেন, তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি বিল আসছে। ব্যাপারটা সমাধানের জন্যই এই মধ্য দুপুরে তার ওয়াসা অফিসে আসা। অফিসার তাকে সহজে ব্যপারটা বুঝিয়ে দিলেন। তার কথা হলো, 'আমরা তো আপনাদের সেবার জন্য এখানে বসেছি। তাহলে আর সমস্যা কি? ঘটনা হলো আপনার ওদিকে যিনি বিল করে তিনি অমুক দলের নেতা। তাছাড়া বুঝেনতো আরো ব্যাপার-স্যাপার আছে। যাই হোক, এটা কোন সমস্যাই না। আপনি কিছু খরচা-পাতি দিয়ে যান, তাহলে সামনের মাস থেকে বিল কম করে করবে। ' বৃদ্ধ ভদ্রলোক অফিসারের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। তিনি মনে মনে হিসাব কষছেন, বিল বেশি আসলে সে টাকা পাবে সরকার। আর বিল কমিয়ে করলে লোকসান হবে সরকারের। আবার বিল বেশি আসলে ক্ষতিগ্রস্থ হবে গ্রাহক। আর কম করলে লাভবাণ হবে 'ওয়াসা'র লোকজন। আবার কম বিল করাতে হলে গ্রাহককে খরচা-পাতি দিতে হবে যেটা পুরো অযৌক্তিক। কারণ তিনি যা খরচ করছেন তাইতো বিল দিবেন। বেশি কেনো দিবেন? আর সেখানে বেশি বিল- কম বিলের প্রশ্ন আসে কেনো? বেশি বিল দিলে তো...

আমি কুকুর ও মানুষের পার্থক্য করতে শিখেছি

সরকারী হলুদ দালান, তার সামনে জড়ো হয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আন্দোলন করছেন। একাধিক দাবী-দাওয়া নিয়ে আন্দোলন শুরু হলেও ঘন্টা খানেকের মধ্যে তা ‘এক দফা-এক দাবী’তে পরিণত হয়। সমস্যা হলো, অনেকক্ষণ চেষ্টা করেও এই এক দফা দাবীটা যে কি, সেটাই বুঝতে পারি নাই। প্রথমে তারা স্লোগান দিচ্ছিলেন ‘আমাদের দাবী মেনে নাও- মানতে হবে মেনে নাও’। শীতের সকালের আমেজ কেটে বাড়ছে রোদের উত্তাপ। রোদের গরমেই কিনা কে জানে, তারা তখন স্লোগান দিতে লাগলো ‘অমুকের গদীতে, আগুন জ্বালো এক সাথে’। আন্দোলনকারীরা পত্রিকা বিছিয়ে রোদ পোহাতে পোহাতে বাদাম চিবুচ্ছিলেন আর শ্লোগান দিচ্ছিলেন। তারা কষ্ট করে উঠে কারো গদিতে আগুন লাগাবে এমন কোন লক্ষণ দেখা গেলো না। বক্তব্য দিতে দিতে নেতার গলায় মনে হয় স্ক্র্যাচ টাইপ কিছু হয়েছে। কথা কেমন ফেটে ফেটে বের হচ্ছে। এরপরেও নিকট ভবিষ্যতে তিনি বক্তব্য থামাবেন বলে মনে হলো না। বেলা বাড়ছে, সেই সাথে বাড়ছে আন্দোলনের উত্তাপ। এমনিতেই আমরা জাতি হিসেবে আন্দোলন প্রিয়। দাবী আদায় হলো কি হলো না, সেটা বড় কথা না। কাজ-কর্ম বন্ধ করে আন্দোলন করাতেই আমাদের বিরাট আনন্দ। তো, কিছুক্ষণের মধ্যেই নেতা ঘোষনা দিলেন, আমরা কর্তৃপক্ষকে রোবব...

একশত বিশ মিনিট এবং একটি নেড়ি কুকুর

অপেক্ষমান মানুষের ভীড়ে তিনি যখন এসে দাঁড়ালেন, তখন শেষ বিকেলের আলো মেঘের সাথে লুকোচুরি খেলছে। মেঘের কিনারা ঘেষে নেমে আসা বর্ণালী উপভোগের ফুসরত তার নেই। তিনি তাকিয়ে আছেন জ্যামে আটকে থাকা গাড়িগুলোর দিকে। তার চোখ খুঁজছে কল্যাণপুর যাবার বাস। তার সাথে আরো অনেক মানুষ দাঁড়ানো। বৃদ্ধ, শিশু, নারী- একেকজনের গন্তব্য একেক জায়গায়। কিন্তু সবার মধ্যেই একটি জিনিস খুব বেশি মিল- সবার চোখেই ক্লান্তি, হতাশা। তার বাম পাশের ছেলেটিকে তিনি দেখছেন। কিছুক্ষণ আগেই হয়তো অফিস থেকে বের হয়েছে। ঘামে ভেজা চোখ-মুখ। সারাদিন প্রচন্ড পরিশ্রম করে হয়তো বাসায় গিয়ে বিশ্রাম নেবে। তার সামনেই এক ভদ্র মহিলা। এক হাতে অফিস ব্যাগ, অন্য হাতে সবজি ভরা বাজারের থলে। এভাবে এই মহিলা বাসে উঠবে কিভাবে? অথচ তাকে তো বাসায় যেতেই হবে। হয়তো তার ছোট্ট বাচ্চাটি তার কোলে ওঠার জন্য সকাল থেকে বসে আছে। একটু দূরে এক যুবক এক হাত দিয়ে স্ত্রীর হাত এবং আরেক হাত দিয়ে বৃদ্ধ মায়ের হাত শক্ত করে ধরে আছে। এরা কোথায় যাবে কে জানে? দীর্ঘক্ষণ পর পর একটি করে বাস আসে। যুবক এগিয়ে যায়। হয়তো যুদ্ধ করে আর দশজনকে মাড়িয়ে সে বাসে উঠতে পারবে, কিন্তু তার স্ত্রী আর মায়ের কি হবে...

একা মেয়েটি

বিকেল শেষ হয়ে আসছে। একটু পরেই সন্ধ্যা হবে। মেয়েটি মন খারাপ করে বারান্দায় একা বসে আছে। অনেক সময় ধরে ফেইসবুক, ইনস্ট্রাগ্রাম, ভাইবারে বন্ধুদের ধরতে চেষ্টা করেছে। সবাই অফ লাইনে। প্রচন্ড বিরক্তি নিয়ে মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে ও। বেশ কিছু সময় ধরে সবগুলো নোটিফিকেশন চেক করে। কিছু পেইজে লাইক করে, শেয়ার করে। এরপর ফোনটা বিছানার ওপর ছুড়ে ফেলে দেয়। ও বসে বসে বোর হচ্ছে কিন্তু ওর সাথে গল্প করার কেউ নেই। টিভি দেখতেও ভালো লাগছে না। আম্মু রান্নাঘরে রান্না করছে। শংকরের এই ছোট্ট, সুন্দর বাসাটায় ও এবং ওর আম্মু থাকে। বাসায় একটি মাত্র বারান্দা। বারান্দায় দাঁড়ালে নিচের রাস্তা দেখা যায়। রাস্তায় পাশে একটা মন্দির ছিলো। এখন ভেঙ্গে ফেলেছে। ওটা দেখা যায়। ওই মন্দিরের পাশে একজন মানুষ জুতো বিক্রি করে। মনে হয় ওপর থেকে হাত বাড়ালেই পছন্দ করে একজোড়া জুতো নিয়ে যাওয়া যায়। অথবা চিৎকার করে লোকটাকে বলা যায়, ‘ভাই, আমার ঐ জুতোটা পছন্দ হয়েছে। উপরে দিয়ে যান’। বারান্দা দিয়ে সামনের বিল্ডিংটাও দেখা যায়। কিন্তু আজ মেয়েটার মন অনেক খারাপ। আশে পাশে এতো কিছু! কিছুই দেখতে ইচ্ছে করছে না। মনে হচ্ছে, সব কিছু বিরাট একটা হাতুড়ি দিয়ে ...

হৃদপিন্ডটা তার নিজের ছিলো

জনাব নাহিদ শিক্ষক মানুষ। আজীবন স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন। আজকে ওনার ওপেন হার্ট সার্জারি। স্বাধীনতার ৭০ বছর পর চিকিৎসা বিজ্ঞানের এতো বেশি অগ্রগতি হয়েছে যে, এই সব টুকটাক ওপেন হার্ট সার্জারিকে ডাক্তাররা হিসাবের মধ্যেও ধরে না। তারপরেও, অপারেশন বলে কথা। একটা জলজ্যান্ত হার্টকে কেটে ছিড়ে আবার জায়গামত বসিয়ে দেবে। ভাবতেই জনাব নাহিদের কিঞ্চিত ভয় অনুভূত হচ্ছে। অপারেশন থিয়েটারে ঢোকার আগে থেকেই নিয়ত করেছেন অপারেশন শুরু হবার আগ পর্যন্ত এক হাজারবার বড় খতমের দোয়া পড়বেন। এখনো দোয়া পাঠ চলছে। কিন্তু অপারেশনের আতঙ্কে কতবার পড়েছেন ভুলে গেছেন। কে জানি বল্লো ডাক্তার আসছে। অপারশন রুমের সবাই রেডি। নাহিদ সাহেব খেয়াল করলেন তার হাত একটু একটু কাঁপছে। বড় খতমের দোয়া না পড়ে ভুলে আসতাগফিরুল্লাহ পড়া শুরু করেছেন। ডাক্তারের মুখে মাস্ক। হাতে কাচি নিয়ে অপারেশন বেডে শুয়ে থাকা রোগী নাহিদ সাহেবের দিকে এগোলেন। চোখাচোখি হতেই ডাক্তার থমকে গেলেন। মুখের মাস্ক ছুড়ে ফেলে আনন্দে চিকৎকার করে উঠলেন, স্যার আপনি??? নাহিদ সাহেব আগতাগফিরুল্লাহ কতবার পড়েছেন সে হিসাব মেলানোর চেষ্টা করছিলেন। একজন মানুষ তার হার্টটা খুলে নাড়াচাড়া করছেন, এটা ভা...

‌একুশে অক্টোবর, দুপুর

বৃষ্টির মূহুর্ত্বগুলো খুব সুন্দর। অবসরে সময়ে গাছের পাতায় পড়ে টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়া বৃষ্টির ফোটাগুলোকে অনুভব করি। সব ব্যবস্তাকে ছুটি দিয়ে আয়েশি হয়ে শব্দের ছন্দপতন শুনতে থাকি। ঝুম বৃষ্টিতে মনে হয় পৃথিবীটা জুড়ে যদি কেবল সবুজ সব গাছ আর তার পাতায় ছন্দের মতন নেমে আসে ফোঁটা ফোঁটা পানির কণা থাকতো! অঝরে বৃষ্টি পড়ছে বুঝতে পারিনি। অফিসের দরজা খুলতেই অবাক হলাম। কিছুক্ষণ পূর্বেও রোদ ছিলো। অপেক্ষ করবো কি করবো না ভাবতে ভাবতেই নিচে নেমে এলাম। ব্যাগ থেকে ছাতাটা খুলে নেমে গেলাম মোজাইক বাঁধানো ফুটপাতে। শো'রুম গুলোর সামনের অংশ কাঁদা আর পিচ্ছিল পাথরে একাকার । তার উপর দিয়ে হাটতে হবে, খুব সাবধানে। অপেক্ষা করলেই পারতাম। অথবা ছাতাটা বন্ধ করে বৃষ্টিতে ভেঁজা যেতো। আধো ভেঁজা হয়ে পকেটের সেল ফোন আর ওয়ালেট সামলাতে সামলাতে গিয়ে পড়লাম সতর্কভাবে রাস্তা পাহারা দেয়া পুলিশের সামনে। প্রধানমন্ত্রী যাবেন। রাস্তায় কোন বাস নেই। প্রবল বৃষ্টি আর ফাঁকা রাস্তা। উঁচু দালানগুলোর উপরে সতর্কভাবে পাহারা দিচ্ছে পুলিশ। ঝাপসা হয়ে যাওয়া উইন্ডশীল্ড'র পেছন থেকে র‍্যাবের অফিসার তাকিয়ে আছেন। একজন মুরুব্বিমত অফিসার এগিয়ে ...